Showing posts with label ইসলামী অর্থনীতি. Show all posts
Showing posts with label ইসলামী অর্থনীতি. Show all posts

Saturday, September 21, 2019

রিবা নিয়ে জানা সিরিজের স্ক্রিপ্ট -১০


রিবার প্রসার রোধ করতে ইসলামের নানা নিয়ম 

আমরা আগের পর্বগুলোতে দেখেছি টাকার ডিমাণ্ডের চেয়ে সাপ্লাই বেশী হলে সুদভিত্তিক সমাজ গড়ে ওঠে। এমনটা যেন না হয় সেজন্য ইসলাম শুধু রিবাই নিষিদ্ধ করে নি, আরো নানা নিয়ম বেঁধে দিয়েছে
প্রথমত, যাকাতের বিধান দিয়েছে। এর মাধ্যমে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশী টাকা ১ বছরের বেশী সময় ধরে জমানো থাকলে সেটার নির্দিষ্ট অংশ দান করে দিতে হয়, অর্থ্যাৎ বাজারে ছেড়ে দিতে হয়। সহজভাবে বলতে গেলে, এটা টাকার সাপ্লাই বাড়িয়ে দেয় যেন ডিমান্ড ও সাপ্লাই এর মাঝে একটা ভারসাম্য থাকে  
অনেকের হয়তো মনে হতে পারে যে যাকাত নিজেই টাকার ডিমাণ্ড সৃষ্টি করতে পারে যদি  যাকাত ফরয এমন ব্যক্তিদের নিজস্ব আয় না থাকে। যেমন বাড়ির গৃহকর্ত্রী। তার হয়তো নিসাব পরিমাণ স্বর্ণালংকার আছে, কিন্তু আয় নেই এখানে আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে যাকাত মুদ্রা দিয়েই আদায় করতে হবে ব্যাপারটা এমন না স্বর্ণালংকারের কিছু অংশ বেঁচে দিয়েও ঊনারা যাকাত আদায় করতে পারেন আবার যখন গৃহপালিত পশু বা অনুরূপের উপর যাকাত ফরয হয়, তখনো সেই সম্পদের একটা অংশ দিয়েই যাকাত দেয়া যায় অর্থ্যাৎ যাকাত মুদ্রার ডিমাণ্ডের উপর কোনো অযাচিত চাপ সৃষ্টি করে না, কিন্তু সাপ্লাই বাড়ায়
যাকাত যে নির্দিষ্ট খাতগুলোতে দিতে হয় সেগুলো নিয়ে চিন্তা করলেও আমরা দেখবো যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা এমন ব্যক্তি যাদের ক্যাশ টাকা সবচেয়ে বেশী দরকার এবং সুদ ভিত্তিক ঋণ নেয়ার সম্ভাবনা খুবই প্রবল। তাদেরকে ক্যাশ টাকা বা আয়ের উৎস (গৃহপালিত পশু, কৃষিজাত পণ্য) দিয়ে সেই সম্ভাবনার দ্বার রুদ্ধ করা হয়।  এভাবে যাকাত অর্থনীতিতে সুদের প্রসার প্রতিরোধে অবদান রাখে
দ্বিতীয়তঃ অপ্রয়োজনে ঋণ নেয়াকে নিরুৎসাহিত করা। সমাজে রিবার বিস্তারের একটা হাতিয়ার হল সুদী ঋণের সহজলভ্যতা। এনজিও, ক্রেডিট কার্ড কোম্পানিগুলো অনেক সময়ই তথাকথিত সহজ শর্তের কথা বলে আমাদেরকে নানা বিলাসিতা, ভোগবাদিতা ইত্যাদির প্রলোভন দেখায় এবং সুদভিত্তিক লেনদেনের সাথে অভ্যস্ত করে তোলার চেষ্টা করে। আদতে এগুলো ঋণের ফাঁদ ছাড়া আর কিছুই না, এভাবে টাকার কৃত্তিম ডিমাণ্ড সৃষ্টি হয়।  
আমরা যদি ইসলামের এই ব্যাসিক নীতিমালাগুলো মেনে চলি তাহলে আমরা সমাজে সুদের বিস্তার রোধে অবদান রাখতে পারবো ইনশাল্লাহ। 



Sunday, August 18, 2019

রিবা নিয়ে জানা সিরিজের স্ক্রিপ্ট -৮



            
হাদীস থেকে পাওয়া মুদ্রানীতি 

আগের পর্বে আমরা দেখেছি যে সকল পণ্যের ( যেমন ভাত, ডাল, পোশাক-আশাক) দামই নির্ধারিত হয় তুলনামূলক ডিমাণ্ড এবং সাপ্লাই এর উপর নির্ভর করে। যদি ডিমাণ্ড সাপ্লাই এর চেয়ে বেশী হয় তাহলে দাম বেশী এবং সাপ্লাই ডিমাণ্ডের চেয়ে বেশী হলে দাম কম......এভাবে

তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে যে যেহেতু টাকার ডিম্যাণ্ডের তুলনায় সাপ্লাই কম হলেই টাকার মালিক/ নিয়ন্ত্রকরা সুদ আরোপ করার সুযোগ পায় তাহলে টাকার দামও এভাবে নির্ধারিত হলে সমস্যা কোথায়? সুদকে আমরা টাকার দাম হিসেবে চিন্তা করতেই পারি

কিন্তু না, ইসলামে মুদ্রাকে আর দশটা পণ্যের সাথে একই কাতারে ফেলা যায় না। এব্যাপারে হাদীসে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ

‘‘সোনার বিনিময়ে সোনা, রূপার বিনিময়ে রূপা, গমের বিনিময়ে গম, যবের বিনিময়ে যব, খেজুরের বিনিময়ে খেজুর, লবণের বিনিময়ে লবণ ক্রয় বিক্রয়ের ক্ষেত্রে উভয় বস্ত্তকে যেমনকার তেমন, সমান সমান এবং হাতে হাতে হতে হবে। অবশ্য যখন উভয় বস্ত্তর শ্রেণী বা জাত বিভিন্ন হবে, তখন তোমরা তা যেভাবে (কমবেশী করে) ইচ্ছা বিক্রয় কর; তবে শর্ত হল, তা যেন হাতে হাতে (নগদে) হয়’’ (মুসলিম ১৫৮৭)

আপাতদৃষ্টিতে এই হাদীসটি পড়ে খটকা লাগতে পারে পারে। যদি আমি নগদে এবং সমান পরিমাণে লেনদেন করি, তাহলে সেই লেনদেনের দরকারটা কী! আর এমন অবাস্তব লেনদেন নিষিদ্ধ করারই বা কী দরকার!

কিন্তু আমরা যদি হাদীসটি গভীর মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করি, তাহলে বুঝবো যে হাদীসে উল্লেখিত পণ্য গুলো আসলে তখন মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হত। হাদীসটি আসলে ইসলামে মুদ্রার ব্যাপারে মূলনীতি নির্ধারণ করে দিচ্ছে! 

মুদ্রা তথা বিনিময়ের মাধ্যম থেকে সুবিধা আসলে দুইভাবে নেয়া যায়ঃ

১) দেরীতে শোধ করার সুযোগ থাকলে
২) খারাপ কোয়ালিটির বেশী পরিমাণের সাথে  ভালো কোয়ালিটির কম পরিমাণ লেনদেন করার মাধ্যমে 

এই হাদীসে এই উভয় জিনিসই নিষেধ করে দিয়েছে। অর্থ্যাৎ বিনিময়ের মাধ্যম থেকে সুবিধা নেয়ার সম্ভাব্য সকল রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে 

এক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে এখানে এমন একটি অর্থনীতির কথা বলা হয়েছে যেখানে নানা ধরণের পণ্যই (যেমন খেজুর, লবণ ইত্যাদি) মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাহলে মুদ্রা হিসেবে প্রচলিত এমন পণ্যের বিভিন্ন কোয়ালিটির থেকে যদি কারো উপযোগ সৃষ্টি হয় (যেমন ২২ ক্যারাটের সোনা আর ১৮ ক্যারেটের সোনা) এবং কেউ যদি এর মাঝে লেনদেন করতে চায় তাহলে করণীয় কী? আলহামদুলিল্লাহ, হাদীস থেকে আমরা সেটাও জানতে পারি-

আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) ও আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক ব্যক্তিকে খায়বারে তহসীলদার নিযুক্ত করেন। সে জানীব নামক (উত্তম) খেজুর নিয়ে উপস্থিত হলে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, খায়বারের সব খেজুর কি এ রকমের? সে বলল, না, আল্লাহর কসম, হে আল্লাহর রসূল! এরূপ নয়, বরং আমরা দু’ সা’ এর পরিবর্তে এ ধরণের এক সা’ খেজুর নিয়ে থাকি এবং তিন সা’ এর পরিবর্তে এক দু’ সা’। তখন আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, এরূপ করবে না। বরং মিশ্রিত খেজুর দিরহামের বিনিময়ে বিক্রি করে দিরহাম দিয়ে জানীব খেজুর ক্রয় করবে। (সহীহ বুখারী  ক্রয়-বিক্রয়  ২২০২) 

এথেকে আমরা বুঝলাম যে  একটি বস্তুকে একই সাথে পণ্য আর মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। যদি পণ্য হিসেবে ব্যবহার করতে হয় তাহলে অন্য মুদ্রার সাথে বাজারে লেনদেন করতে হবে। মানে ১৮ ক্যারাটের সোনা বাজারে বিক্রি করে যে টাকা পাওয়া যাবে, সেটা দিয়ে যতটুকু ২২ ক্যারাটের সোনা পাওয়া যায়, সেটা কিনতে হবে। 

প্রশ্ন উঠতে পারে যে মুদ্রাকে এভাবে আলাদা করার কারণ কীআসলে মুদ্রার কাজ আর সব পণ্যের থেকে আলাদা যেমনটা আমরা আগে দেখেছি। মুদ্রার মাধ্যমে কোনো পণ্যের উপযোগের পরিমাণ প্রকাশ করা হয়, মূল্য নির্ধারণ করা হয়, বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয় ইত্যাদি।

মুদ্রার এই বিশেষত্বের জন্যই মুদ্রাকে অন্য সব পণ্যের মত চিন্তা করে সুদকে মুদ্রার দাম হিসেবে চিন্তা করার কোনো সুযোগ নেই। 



রিবা নিয়ে জানা সিরিজের স্ক্রিপ্ট -৭


      মুদ্রাভিত্তিক অর্থনীতিতে মুনাফার সংজ্ঞা



আমরা এখন বাস করি মুদ্রাভিত্তিক অর্থনীতিতে যেখানে সব লেনদেন মুদ্রার বিনিময়ে হয়ে থাকে। এই অর্থনীতিতে মুনাফার সংজ্ঞা বোঝার আগে আমরা জেনে নিবো মুদ্রার ভূমিকা বা কাজ।   

মুদ্রার কাজ মূলত ৩টি-

১) পণ্য থেকে পাওয়া উপযোগের মাপকাঠি (Measure of Value) 

কোনো বস্তু থেকে আমরা যে উপযোগ/ Value পাই সেটার পরিমাণ মুদ্রার মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তাই আমরা এভাবে বলে থাকি যে এই জামাটা থেকে আমি ৫০০ টাকার সমমানের উপযোগ পাই। এক্ষেত্রে মুদ্রা শুধুই একটা তথ্য হিসেবে কাজ করে

) পণ্যের মূল্যের রেফারেন্সঃ

আমরা যদি কিছু কিনতে চাই, সেটার দাম প্রকাশিত হয় মুদ্রা দ্বারা। যেমন ল্যাপটপের দাম হতে পারে ৩০,০০০টাকা। এভাবে ২টা জিনিসের মূল্যের মাঝে আমরা তুলনাও করতে পারি । একটা ল্যাপটপ নাকি একটা স্বর্ণের চেইন……কোনটা বেশী দামী সেটা আমরা বুঝতে পারি তাদের মূল্য থেকে যা মুদ্রার এককে প্রকাশিত। 

৩) বিনিময়ের মাধ্যম (Medium of exchange)ঃ

আমরা যা কিছুই কিনতে চাই, মুদ্রার বিনিময়ে কিনতে পারি যেমনটা আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে করে থাকি।

এখানে লক্ষণীয় যে কোনো বস্তু থেকে পাওয়া উপযোগের মুদ্রা মান আর সেটার দাম কিন্তু এক নাও হতে পারে। আমি যদি কোনো জামা থেকে ৫০০ টাকার সমান উপযোগ পাই তাহলে আমি হয়তোবা ওই জামাটার জন্য ৫০০ টাকাই দিতে রাজি থাকবো। কিন্তু বাজারে হয়তো সেটার দাম ৪০০ টাকা।

বাজারে কোনো পণ্যের মূল্য তথা দামটা আসলে নির্ধারিত হয় সেটার তুলনামূলক ডিমাণ্ড ও সাপ্লাইয়ের ভিত্তিতে। 

আগের পর্বে আমরা দেখেছি একজন মাত্র কৃষক ও মাছওয়ালার উদাহরণ যারা এক প্লেট ভাত ও একটি মাছ লেনদেন করেছে। এখন এমনও তো হতে পারে যে বাজারে আরো মাছওয়ালা আছে যে এক প্লেট ভাতের বিনিময়ে দুটি বা কেউ তিনটি মাছ দিতে ইচ্ছুক... আবার চালও আরো অনেকে বিক্রি করে। 

এভাবে ডিম্যাণ্ড ও সাপ্লাইয়ের মিথস্ক্রিয়াতে যে 'দাম' নির্ধারিত হয়, তা সাধারণত ক্রেতা বা বিক্রেতা যে দামে কেনা বেচা করতে রাজি থাকে তার সমান না। ক্রেতা যত দাম দেয়, সাধারণত জিনিসটা থেকে পাওয়া উপযোগের মূল্যমান তার চেয়ে বেশী থাকে, মানে সে এর চেয়ে বেশী দামে কিনতে রাজি ছিলো। এই দুটো পরিমাণের মাঝে পার্থক্যকে আমরা বলতে পারি ক্রেতার দিক থেকে মুনাফা। প্রচলিত অর্থনীতির ভাষায় এটা Consumer Surplus নামে পরিচিত।

একই কথা বিক্রেতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সেও আসলে জিনিসটা বেঁচে যত টাকা পায়, তার চেয়ে কম টাকায় বিক্রি করতে রাজি ছিল, মানে জিনিসটার উপযোগের মূল্যমান তার পাওয়া টাকার চেয়ে কম। সেজন্যই সে আসলে জিনিসটা বেঁচে দিতে চাইছে। প্রচলিত অর্থনীতির ভাষায় এটা Producer Surplus নামে পরিচিত।

এজন্য আমরা খুব সহজ ভাষায় বলি যে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে পার্থক্যকে মুনাফা বলে
 মুনাফা= বিক্রেতা বিক্রি করে যত টাকা পেয়েছে (আয়)- যত টাকায় বেঁচতে রাজি ছিল (খরচ) 

এই সংজ্ঞার নেপথ্যের ঘটনাটা আমরা এতক্ষণ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলাম। সেই সাথে আমরা দেখানোর চেষ্টা করলাম যে ক্রেতার দিক থেকেও মুনাফাকে ব্যাখ্যা করা যায়।

তাহলে সুদ আর মুনাফার মাঝে পার্থক্য কি আমাদের কাছে স্পষ্ট হল কিছুটা? মূল পার্থক্য যেটা আমাদের ব্রেনে গেঁথে নেয়া দরকার, সেটা হচ্ছে মুনাফাতে সরাসরি কোনো পণ্যের লেনদেনের মাধ্যমে দুই পক্ষেরই উপযোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে (Increase of Value) বা নতুন উপযোগের সৃষ্টি হচ্ছে (Creation of Value) কিন্তু সুদের ক্ষেত্রে শুধু বিনিময়ের মাধ্যম লেনদেন করা হচ্ছে। যার কাছে টাকা নেই তাকে স্রেফ লেনদেনের সুযোগ করে দেয়ার বিনিময়ে অতিরিক্ত চার্জ নেয়া হচ্ছে।

এখন উপযোগ কিভাবে সৃষ্টি করা যেতে পারে? 
·      আমার দক্ষতা কাজে লাগিয়ে আমি কোনো বস্তুর রূপান্তর ঘটাতে পারি (যেমন কাপড় থেকে জামা বানাতে পারি, আটা থেকে রুটি, পিঠা)। যাদের এগুলো করার সময়/ এনার্জি/ দক্ষতা নেই তাদের কাছে বেশী দামে বিক্রি করতে পারি
·      আমরা কোনো জিনিসকে সহজলভ্য করতে পারি ধরুন সুপার স্টোর গুলোতে জিনিস পত্রের দাম বেশী হয় কারণ সেখানে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশে, সাজানোভাবে অনেক কিছু এক সাথে পাওয়া যায় যেটা হয়তো এলাকার কাঁচা বাজারগুলো থেকে কেনা কষ্টকর।
·      আমরা কোনো জিনিস দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষণ করতে পারি যেন মৌসুম ছাড়াও তা পাওয়া যায়।
এরকম আরো উদাহরণ দেয়া যায় যেখানে ঝুঁকি (Risk) নিয়ে বা ওয়ারেন্টি দিয়ে (Liability) বা নতুন উপযোগ সৃষ্টি করে মুনাফা অর্জন করা যায়।

তাহলে সুদ এবং মুনাফার মাঝে মূল পার্থক্যগুলো আসুন এক নজরে আবারো একটু দেখে নেই





Saturday, August 17, 2019

রিবা নিয়ে জানা সিরিজের স্ক্রিপ্ট -৬


   অর্থনৈতিক দিক থেকে মুনাফার সংজ্ঞা
প্রথম ৫টি লেসনে আমরা রিবা নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারনা এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে রিবার সংজ্ঞা কী তা বোঝার চেষ্টা করেছি। আজকের পর্বে  আমরা বোঝার চেষ্টা করবো , অর্থনৈতিক দিক থেকে মুনাফা বলতে আসলে কী বোঝায়।রিবা নিয়ে তো অনেক কথাই হল। এখন নিশ্চয়ই আমাদের জানতে ইচ্ছা করছে যে মুনাফা কী। 

আমরা আমাদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝি যে কোনো জিনিস ভোগ করতে থাকলে সেটার আকর্ষণ আমাদের কাছে কমতে থাকে। যেমন কমলা যদি আপনার খুব পছন্দ হয় তাহলে প্রথম ১-২টা কমলা খেতে আপনার যত ভালো লাগবে, পরের গুলো খেতে আরে তত ভালো লাগবে না। একসময় ভালো তো আর লাগবেই না, বরং খারাপ লাগবে/ বমি আসবে। অর্থনীতির ভাষায় একে বলে Law of diminishing marginal utilityনিচে ব্যাপারটা একটা ছবির সাহায্যে বোঝানোর চেষ্টা করা হল-


মনে করুন একজন কৃষক, যে ধান উৎপাদন করে। তার কাছে এক প্লেট ভাত থেকে প্রাপ্ত সুবিধা/ উপযোগ কমতে কমতে একসময় নেগেটিভ হয়ে যাচ্ছে। মাছ ওয়ালা, যে মাছ ধরে, তার ব্যাপারেও এমনটি হয়। কোনো জিনিস যখন আমার কাছে পরিমাণে অনেক থাকে, সেটা আমার কাছে অপ্রয়োজনীয় লাগতে থাকে। আমি সেটা আর নিজের কাছে রাখতে চাই না। এই অতিরিক্ত অংশটা  দিয়ে লেনদেন করতে পারি এবং বিনিময়ে এমন জিনিস পেতে পারি যেটা থেকে আমি অনেক বেশী সুবিধা/ উপযোগ পাবো। এতে দুই পক্ষই  লাভবান হতে পারে। 

উদাহরণস্বরূপ বলা যায় একজন কৃষক যে এক প্লেট ভাতের বিনিময়ে একটা মাছ নিলোযে ভাত দিয়ে দিলো, সেই প্লেটের উপযোগ তার কাছে ছিল ১০ ইউনিট, আর যে মাছটা পেল, তারটা হল ১০০ ইউনিট। তাহলে কাটাকাটি করার পরও তার নেট উপযোগ বেড়ে গেলো, থাকলো ৯০ ইউনিট। একই কথা মাছওয়ালার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তার কাছে মাছের প্রান্তীয় উপযোগ খুবই কম কিন্তু যে ভাতের প্লেটটা পেলো, সেটারটা অনেক বেশী





লেনদেনের ফলে এই যে  উপযোগের যে বৃদ্ধি ঘটে, এটাই হচ্ছে মুনাফা বা লাভ

খেয়াল করলে দেখবো যে আমরা কিন্তু এখানে বিনিময় অর্থনীতির কথা বলছি যেখানে পণ্যের সাথে পণ্যের বিনিময় হচ্ছেএটা আজকাল হয় না বললেই চলে।  আমরা এখন বাস করি মুদ্রাভিত্তিক অর্থনীতিতে যেখানে সব লেনদেনের এক দিকে থাকে মুদ্রা।আগামী পর্বে আমরা মুদ্রাভিত্তিক অর্থনীতিতে মুনাফার স্বরূপ নিয়ে কথা বলবো ইনশাল্লাহ। 


রিবা নিয়ে জানা সিরিজের স্ক্রিপ্ট -৯

        অর্থনীতিতে রিবার প্রভাব

আগের পর্ব পড়ে আমাদের মনে হতে পারে যে মুদ্রা থেকে কোনো ধরণের সুবিধা নিতে আল্লাহ আমাদের কেন নিষেধ করলেন? সুদ জিনিসটাতে ঝামেলা কোথায়?
একটু চিন্তা করলে দেখবো যে আমাদের বেঁচে থাকার জন্য যা কিছু প্রয়োজন-খাবার, পোশাক, চিকিৎসা-সব কিছু যোগাড় করতেই মুদ্রা লাগে। আপনার কাছে যদি মুদ্রা না থাকে তাহলে আপনার যত দক্ষতা বা যোগ্যতাই থাকুক না কেন আমাদের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব হবে না কারণ আমরা লেনদেন করতে পারবো না
এখন একটা সমাজ যদি সুদভিত্তিক হয়, তাহলে সেই সমাজে যাদের হাতে মুদ্রা আছে তাদের কাছে বাকিরা জিম্মি হয়ে পড়বে। ব্যাপারটা বুঝতে আসুন একটা দৃশ্য কল্পনা করি। আপনি একজন দর্জি এবং খুব ভালো ড্রেস বানাতে পারেন। কিন্তু আপনার সেই দক্ষতা কাজে লাগানোর জন্য আপনার দরকার পুঁজি যা দিয়ে আপনি সেলাই মেশিন কিনবেন। যে আপনাকে সেলাই মেশিন কেনার টাকা ধার দিলো, সে আপনাকে শর্ত জুড়ে দিলো যে আপনি যা ড্রেস বানাবেন সব ঋণদাতার কাছে তার নির্ধারণ করা দামেই বেঁচতে হবে। এখন আপনার কাছে যেহেতু আর কোনো উপায় নেই, তাই আপনি এই শর্তে রাজি হলেন। তাহলে আপনি দেখবেন যে যতই সময় যাক না কেন আপনার অর্থনৈতিক অবস্থা একই রকম রয়ে গেছে। 
এখন ব্যাপারটা যদি এমন হয় যে অতিরিক্ত চার্জ ছাড়া কেউই মুদ্রা ধার দিচ্ছে না বা উপরের কেসটির মত কোনো শর্ত জুড়ে দিচ্ছে তখন সেই সমাজের বেশিরভাগ মানুষের অবস্থা হবে দুর্বিষহ, কারণ তারা ঠিকমত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে পারবে না। আর  অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডই হচ্ছে একটা সমাজের চালিকা শক্তি। এ যেন আমাদের শরীরের মত, যখন রক্ত চলাচল করতে পারে না, তখন প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও অন্যান্য উপাদান শরীরের জরুরী অংশগুলোতে পৌঁছাতে পারে না এবং আমরা নানা রকম রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হই রিবা বা সুদ তাহলে শরীরের রক্ত তথা বিনিময়ের মাধ্যমকে জমাট বাধিয়ে দেয়, এটার অবাধ চলাচলে বাঁধা সৃষ্টি করে  
একটা সমাজে যদি রিবার প্রসার ঘটে তখন মানুষ নিজের অজান্তেই এক শ্রেণীর মানুষের দাস হয়ে যায়। সেই শ্রেণী মানুষের অসহায়তার সুযোগ নিতে কার্পণ্য করে না। এমন জুলুম ও শোষণের দ্বার বন্ধ করতেই ইসলাম কাউকে টাকা ধার দিলে বিনিময়ে অতিরিক্ত চার্জ আদায় করা একদমই নিষিদ্ধ করে দিয়েছে, ধার দিলে দিতে হবে কর্জে হাসানা, অর্থ্যাৎ যতটুকু ধার দেয়া হয়েছে শুধু সেটুকুই ফেরৎ নেয়া যাবে। শুধু তাই না, ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে অতিরিক্ত কোনো সুবিধাও নেয়া যাবেনা যেমনটা আমরা উপরে দেখেছি। সহজ শর্তে ঋণ বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব ইসলামে নেই। ঋণ দিলে কোনো শর্তই আরোপ করা যাবে না। 








Monday, July 29, 2019

রিবা নিয়ে জানা সিরিজের স্ক্রিপ্ট -৫



অর্থনৈতিক দিক থেকে রিবার সংজ্ঞা


আগের পর্বগুলোতে আমরা রিবা নিয়ে আমাদের সমাজে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা নিরসনের চেষ্টা করেছি। আজকের পর্বে আমরা রিবা কী এটা খুব সহজ ভাষায় বোঝার চেষ্টা করবো ইনশাল্লাহ। রিবা কী এটাই যদি আমরা বুঝতে না পারি তাহলে আমরা কিভাবে এটা থেকে দূরে থাকবো?
তবে তার আগে আমাদের মাথায় গাঁথতে হবে যে আল্লাহ সুবহানুহু ওয়া তা’লা রিবা নিষিদ্ধ করেছেন মূলত আমাদের অর্থনৈতিক জীবনটাকে সহজ করার জন্য। তাই আজকে আমরা রিবার সংজ্ঞা বোঝার চেষ্টা করবো একদমই অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে। আমরা বোঝার চেষ্টা করবো যে কখন একটা সমাজে রিবা প্রসারতা লাভ করে।
দৃশ্যপট ১ঃ 
মনে করুন যে আপনি খুব বিপদে পড়েছেন, আপনার বেশ কিছু টাকার খুব দরকার। এখন আপনার আশেপাশে একজন ব্যক্তিই আছে যে টাকা ধার দিবে, শর্ত হচ্ছে সুদ দিতে হবে ১০% হারে তখন আপনি কী করবেন? আপনার আর কোনো উপায় নেই, আপনি যে ব্যক্তি ১০% হারে সুদে ঋণ দিচ্ছে, তার কাছেই যাবেন 
দৃশ্যপট ২ঃ 
এখন আরো একটি দৃশ্য কল্পনা করুন আপনার পরিচিত ২ জন ব্যক্তি আছে ধার দেয়ার মত একজন ৮% হারে দিচ্ছে, আর একজন ১০% আপনি নিঃসন্দেহে যে ৮% হারে দিচ্ছে, তার কাছে যাবেন টাকা এখন আগের বারের চেয়ে একটু কম দুষ্প্রাপ্য 
দৃশ্যপট ৩ঃ  
এবার ভাবুন এমন একটা পরিস্থিতি যেখানে প্রচুর মানুষ আপনাকে বিনা সুদে ধার দিতে রাজি আছে আর কিছু মানুষ আছে যারা ২-৩% সুদ ছাড়া আপনাকে ধার দিবে না তখন কি আপনি রাজি হবেন সুদ দিতে যেখানে সুদ ছাড়াই আপনি টাকা ধার পাচ্ছেন? নিশ্চয়ই না
তাহলে আমরা কি বুঝলাম?
·       একটা এলাকায় বা সমাজে টাকা যত দুষ্প্রাপ্য হয়, সুদের হার তত বাড়তে থাকে  
দৃশ্যপট ৪ঃ 
আসুন এবার একটু অন্যরকম একটা পরিস্থিতি চিন্তা করি একটা সমাজে, টাকার কোনো অভাব নেই, কিন্তু টাকা ইস্যু করার ক্ষমতা  বা সমস্ত টাকার নিয়ন্ত্রণ শুধু একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মাঝেই সীমাবদ্ধ  সেক্ষেত্রে তারা যদি সিদ্ধান্ত নেয় যে সুদ ছাড়া কাউকে টাকা ধার দেয়া হবে না, তাহলে টাকা দুষ্প্রাপ্যই রয়ে যাচ্ছে, টাকার পরিমাণ অঢেল থাকা সত্ত্বেও
এখান থেকে আমরা শিখলাম যে
·      টাকার পরিমাণ অঢেল এমনকি প্রয়োজনের অতিরিক্ত থাকা সত্ত্বেও যদি সব টাকার নিয়ন্ত্রণ কোনো গ্রুপ বা সিণ্ডিকেটের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলেও সেই সমাজে সুদ ছাড়া টাকা পাওয়া অসম্ভব হয়ে যেতে পারে
তাহলে আমরা বুঝলাম যে মূলত টাকার দুষ্প্রাপ্যতাই সুদভিত্তিক লেনদেনকে সম্ভব করে তোলে।এক কথায় যখন টাকার চাহিদা/ ডিমাণ্ডের তুলনায় যোগান/ সাপ্লাই কম হয়, তখনই সুদের হার বেড়ে যায়। 
যদি সিস্টেমটা এমন হয় যে সেখানে টাকা ছাড়া কোনো লেনদেন করা সম্ভব না, তবে পরিস্থিতি আরো কঠিন হয় পড়ে কারণ তাতে টাকার ডিমাণ্ড আরো বেড়ে যায় যাদের কাছে অতিরিক্ত টাকা আছে কিংবা  টাকা সাপ্লাই এর ক্ষমতা যাদের হাতে, তারা এটার সুযোগ নিয়ে সুদের হার বাড়িয়ে দিতে পারে কিন্তু যদি এমন হয় যে কিছুটা হলেও বিনিময় অর্থনীতি বিদ্যমান, মানে মানুষ তার কাছে থাকা টাকা ছাড়া অন্যান্য সম্পদ যেমন চাল, ডাল এগুলো দিয়ে লেনদেন করতে পারে, তাহলে টাকার ডিমাণ্ড কমে যায়। সুবিধাবাদী গোষ্ঠী যাদের কাছে টাকা নেই তাদের অবস্থার সুযোগ অতটা নিতে পারে না 
এখানে একটা বিষয় লক্ষণীয় যে। তারা স্রেফ টাকার সাপ্লাই এর চেয়ে ডিমাণ্ড বেশী-এই অবস্থার, কিংবা টাকার নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে, এটার সুযোগ নেয় 
আশা করি এতক্ষণের  আলোচনায় আমরা বুঝলাম যে কখন একটা সমাজে সুদ বিরাজ করে কিন্তু এটা থেকে কি আমরা বুঝলাম যে সুদ কী?
সুদ হচ্ছে সেই অতিরিক্ত চার্জ যা বিনিময়ের মাধ্যম তথা টাকা ধার দেয়ার সময় অতিরিক্ত টাকার মালিক/ টাকার নিয়ন্ত্রকরা আদায় করে থাকে 
সহজ ভাষায় একে আমরা একটা সেতুর টোলের সাথে তুলনা করতে পারি টোল না দেয়া পর্যন্ত যেমন ব্রিজ পার হওয়া যায় না, সুদ না দেয়া পর্যন্ত টাকার মালিক/ নিয়ন্ত্রকরা বাজারে টাকা ছাড়ে না


Wednesday, July 24, 2019

রিবা নিয়ে জানা সিরিজের স্ক্রিপ্ট -৪

                                           রিবা নিয়ে অন্য ভুল ধারণাগুলো

আগের দুটো পর্বে আমরা মূলত ১ম ভ্রান্ত ধারণাটা নিয়ে কথা বলেছি যে ব্যাংকের সুদ নিষিদ্ধ রিবার অন্তর্ভুক্ত নয় এবং আমরা দেখেছি যে কুরআনের এত কঠোর অবস্থান থাকা সত্ত্বেও মুসলিম দেশগুলোতে কিভাবে রিবা মহামারীর মত ছড়িয়ে গেল। আজকের পর্বে আমরা সংক্ষেপে বাকি ভুল ধারণাগুলো নিয়ে কথা বলবো ইনশাল্লাহ।

              ভুল ধারণা :২

                           মুদ্রাস্ফীতির (Inflation) কারণে সুদ দেয়া বৈধ

আমরা আজকাল প্রায়ই অভিযোগ করে থাকি যে জিনিস পত্রের দাম বাড়ছে তো বাড়ছেই, এর সাথে আমরা তাল মিলাতে পারছি না, হাঁপিয়ে উঠছি। কিন্তু কেন এমনটা হচ্ছে তা কি আমরা বুঝি?
অনেকগুলো কারণের মাঝে একটা কারণ হচ্ছে টাকার মান কমে যাওয়া। এক বছর আগে ১০০টাকায় আমরা যতটুকু জিনিস কিনতে পারতাম, এখন সেই পরিমাণ জিনিস কিনতে আমাদের হয়তো খরচ হবে ১১৫ টাকা। অর্থাৎ একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিয়ে আগে যা কেনা যেত, এখন তার চেয়ে কম জিনিস কেনা যায়, তাই আমাদের মনে হয় যে জিনিস পত্রের দাম বাড়ছে।

এজন্যই আজকে যদি আমি কাউকে ১০০০ টাকা ধার দেই, এক বছর পর যদি সে আমাকে ১০০০টাকাই ফেরৎ দেয়, তাহলে আদতে যেন সে আমাকে ৯৫০টাকা ফেরত দিলো। কারণ এক বছর পর ১০০০টাকা দিয়ে যা কেনা যাবে, এক বছর আগে সেই জিনিস কেনা যেত ৯৫০টাকা দিয়ে। আমি যদি ঋণদাতাকে ১০০০টাকাই ফেরৎ দিতে চাই, আমার দেয়া উচিৎ ১০০০টাকার বেশী যাতে সে আগের ১০০০টাকার সমমূল্যের জিনিস কিনতে পারে। কিন্তু আমি যদি সেটা করি তাহলে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সেটা নিশ্চিতভাবেই সুদ বা রিবা হিসেবে বিবেচিত হবে।

তাই অনেকে বলে থাকেন যে এই ক্ষেত্রে সুদ দেয়া বৈধ কারণ আমি ঋণদাতাকে বেশী কিছু দিচ্ছি না, বরং তার ক্রয় ক্ষমতা যেন ঠিক থাকে সেজন্য আদতে সেই পরিমাণ টাকাই দিচ্ছি যা সে আমাকে দিয়েছিল।

আপাত দৃষ্টিতে যুক্তিটা বেশ সন্তোষজনক মনে হলেও এর মাঝে বিশাল এক চোরাবালি লুকিয়ে আছে যা চোখে পড়বে শুধু তখনই যখন আমাদের বর্তমান অর্থ ব্যবস্থা নিয়ে বিস্তারিত ধারণা থাকবে। এটা নিয়ে খুঁটিনাটি পড়াশোনা করলে আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে এইভাবে টাকার মান যে কমে যাচ্ছে, সেটা হচ্ছেই সুদ ভিত্তিক সিস্টেমের জন্য। তাই আমরা যদি মুদ্রাস্ফীতির (Inflation) এর সুদের সাথে আপোষ করা শুরু করি, তাহলে কোনোদিনও এই চোরাবালি থেকে বের হতে পারবো না। বরং আমরা যদি সবাই সুদ বর্জন করা শুরু করি, তাহলেই এই মুদ্রাস্ফীতি (Inflation) সমস্যা অনেকটাই কমে আসবে। সামনের পর্বগুলোতে যখন আমরা বর্তমান অর্থ ব্যবস্থা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলবো, তখন এই বিষয়ে সকল দ্বিধা দ্বন্দ্ব দূর হয়ে যাবে ইনশাল্লাহ।

                                           ভুল ধারণা :৩
                            
রিবার নিষেধাজ্ঞা বাণিজ্যিক ঋণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়

এটা একেবারেই ভুল একটা কথা। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে মানুষের জীবনযাত্রা আজকের মত এত বস্তুবাদী ছিলো না যে বাড়ি, গাড়ি, বিলাস দ্রব্য কেনার জন্য মানুষ সুদ ভিত্তিক ঋণ নিবে। তখন মানুষ ঋণ নিতোই ব্যবসায়িক উদ্দেশে, আর সেটাই ইসলাম এসে নিষিদ্ধ করেছে।  
      ভুল ধারণা :৪

একান্ত নিরুপায় হলে রিবার সাথে যুক্ত হতে সমস্যা নেই।

এটা সত্যি যে একান্ত নিরুপায় হলে যে কোনো হারাম কাজই ইসলামে সাময়িক বৈধতা পায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে নিরুপায় মানে আসলে কী। এই নিরুপায়তার সংজ্ঞাটা কী আমরা আমাদের খেয়াল খুশিমত বানাতে পারি? নিরুপায়তা বলতে এখানে জীবন বাঁচানোর মত পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে যখন মদ্যপান বা শুকরের মাংস খেয়ে হলেও জান বাঁচাতে হবে। আমরা যখন বাড়ি করার জন্য, গাড়ি কেনার জন্য, বিদেশে ঘুরতে যাওয়ার জন্য বা বিলাসজাত দ্রব্য কেনার জন্য সুদভিত্তিক লেনদেনের সাথে যুক্ত হয়ে পড়ি, তখন কি সেটাকে নিরুপায়তা বলা যায়? এভাবে কাকে ঠকাই আমরা? আমাদের রাবকে যিনি কী না আমাদের অন্তরের অবস্থা আমাদের চেয়েও ভালো জানেন?

         ভুল ধারণা :৫

তৎকালীন সময়ে রিবা ছিলো তীব্র শোষণের হাতিয়ার। একারণেই রিবা নিষেধ করা হয়েছিলো। কিন্তু এখন শক্তিশালী পক্ষও (যেমন সরকার) দুর্বলের (জনগণ) কাছ থেকে ঋণ নেয়। প্রেক্ষিত বদলে যাওয়াতে রিবার নিষেধাজ্ঞা আজকের সময়ে প্রযোজ্য নয়।

আসলে এই ধারণাটা তখনই জন্মায় যখন আমাদের বর্তমান অর্থব্যবস্থা সম্পর্কে জ্ঞান খুবই অপ্রতুল হয়। আগেকার সময়ে মহাজনেরা যখন চক্রবৃদ্ধি আকারে সুদ নিত সেটা ঋণগ্রহীতা ও তার পরিবারের জীবনটা ছিন্নভিন্ন করে দিতো। তখন সেটার প্রভাব শুধু ওই একটা পরিবারের উপরেই পড়তো।  কিন্তু বর্তমান অর্থনীতি সুদভিত্তিক হওয়ার কারণে আমাদের সবার জীবনে নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে, সেটা আমি প্রত্যক্ষভাবে রিবার সাথে জড়িত থাকি আর না থাকি। এক কথায় রিবা এখন আরো বড় শোষণের হাতিয়ার, যদিও সেটা আমরা সরাসরি টের পাই না। আসলে  সরকার আমাদের কাছ থেকে রিবা ভিত্তিক ঋণ নেয় বলেই বরং আমরা আজকে তাদের হাতে জিম্মি।   সামনের পর্বগুলোতে এটা আমরা আরো ভালোভাবে বুঝবো ইনশাল্লাহ।

রিবা নিয়ে জানা সিরিজের স্ক্রিপ্ট -১১

রিবার নানা রূপ আজকের পর্বে আমরা রিবার নানা রূপের সাথে পরিচিত হব যেন দৈনন্দিন জীবনে আমরা সেগুলো থেকে বেঁচে থাকতে পারি-   টাকা ধার নেয়ার...